টাওয়ার হ্যামলেটসে কাউন্সিল অব মস্কসের বার্ষিক সাধারণ সভা
ইসলামোফোবিয়া, মসজিদের নিরাপত্তা, মাদক-অ্যালকোহলসহ কমিউনিটির নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা
পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় মুসলিম কমিউনিটির বিভিন্ন সমস্যা, মসজিদ ও ইসলামিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা, ইসলামোফোবিয়া, মাদক ও অ্যালকোহলজনিত সামাজিক সমস্যা এবং কমিউনিটির কল্যাণে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপের মধ্য দিয়ে কাউন্সিল অব মস্কস টাওয়ার হ্যামলেটসের (Council of Mosques TH) বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) পূর্ব লন্ডনের লন্ডন মুসলিম সেন্টারে এ বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। টাওয়ার হ্যামলেটসের ৫৬টি মসজিদ ও ইসলামিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত কাউন্সিল অব মস্কস টাওয়ার হ্যামলেটসের উদ্যোগে আয়োজিত সভায় বিভিন্ন মসজিদের চেয়ারম্যান, সেক্রেটারি, ইমাম, সংগঠনের কর্মকর্তা ও সদস্যরা অংশ নেন।
সংগঠনের সভাপতি ও বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ হাফিজ মাওলানা শামসুল হকের সভাপতিত্বে সভা পরিচালনা করেন সংগঠনের ট্রেজারার মোহাম্মদ আব্দুল মুনিম জাহেদী ক্যারল ও জয়েন্ট সেক্রেটারি মাহফিজুর রব।
সভায় অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়র কাউন্সিলর মায়ুম তালুকদার। তিনি টাওয়ার হ্যামলেটসের মুসলিম কমিউনিটির বিভিন্ন কল্যাণমূলক কার্যক্রমে কাউন্সিল অব মস্কসের ভূমিকার প্রশংসা করেন। মুসলিম কমিউনিটির বিভিন্ন প্রয়োজন ও সমস্যা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার ক্ষেত্রে সংগঠনটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় সচেতনতার ওপর গুরুত্ব
সভায় ইসলামোফোবিয়া ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক আচরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের কমিউনিটি এনগেজমেন্ট অ্যান্ড পার্টনারশিপ বিভাগের কনসালট্যান্ট ড. আব্দুল্লাহ ফলিক।
তিনি ইসলামোফোবিয়ার বিভিন্ন দিক, এর সামাজিক প্রভাব এবং এ ধরনের বৈষম্য ও বিদ্বেষ মোকাবিলায় কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে মুসলিম কমিউনিটির সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যকর যোগাযোগ ও অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
মসজিদের নিরাপত্তা ও অপরাধ প্রতিরোধ
মসজিদ ও ইসলামিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা এবং অপরাধ প্রতিরোধের বিভিন্ন দিক নিয়ে বক্তব্য দেন টাওয়ার হ্যামলেটসের প্রোটেকটিভ অ্যান্ড ক্রাইম প্রিভেনশন ম্যানেজার আর্টুর পানকওসিক।
তিনি মসজিদ ও ইসলামিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ এবং অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সম্পর্কে আলোচনা করেন। স্থানীয় প্রশাসন ও মসজিদ কর্তৃপক্ষের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও সহযোগিতা থাকলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা সম্ভব বলেও আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মাদক ও অ্যালকোহল নিয়ে উদ্বেগ
সভায় মাদক ও অ্যালকোহলজনিত সামাজিক সমস্যা নিয়েও আলোচনা হয়। এ বিষয়ে বক্তব্য দেন সার্ভিস ম্যানেজার মিজান চৌধুরী। তিনি মাদক ও অ্যালকোহলের কারণে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে সৃষ্ট বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরেন এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে এসব সমস্যা থেকে দূরে রাখতে পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
বক্তারা বলেন, মুসলিম কমিউনিটির বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু পৃথকভাবে উদ্যোগ নিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। মসজিদ, ইসলামিক প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, কমিউনিটি সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ানোর মাধ্যমে এসব সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব।
কমিউনিটির ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার আহ্বান
বার্ষিক সাধারণ সভায় কমিউনিটির বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে মতবিনিময়ের পাশাপাশি মসজিদ ও ইসলামিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, সহযোগিতা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভায় বক্তারা বলেন, টাওয়ার হ্যামলেটসের মুসলিম কমিউনিটির একটি বড় অংশ মসজিদ ও ইসলামিক প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রমে সম্পৃক্ত। ফলে কমিউনিটির কল্যাণে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি, সামাজিক সমস্যা মোকাবিলা এবং মুসলিম কমিউনিটির নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি
বার্ষিক সাধারণ সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন ইস্ট লন্ডন মসজিদের চেয়ারম্যান ড. আব্দুল হাই মুর্শেদ, কাউন্সিল অব মস্কস টাওয়ার হ্যামলেটসের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারুক আহমেদ, ভাইস প্রেসিডেন্ট শামসুল হক এবং নির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ মইন উদ্দিন মজুমদার, মোহাম্মদ আতিক মিয়া, মোহাম্মদ বশির আহমেদ, মোহাম্মদ মুসলেহ উদ্দিন, ইতোয়র হোসেন মুজিব, নুরুল উল্লাহ ও আরজ মিয়া।
এ ছাড়া টাওয়ার হ্যামলেটসের বিভিন্ন মসজিদ ও ইসলামিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, সেক্রেটারি, ইমাম, কর্মকর্তা এবং সংগঠনের অন্যান্য সদস্য সভায় অংশগ্রহণ করেন।
সভায় সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় করা হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে মুসলিম কমিউনিটির কল্যাণে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন, মসজিদ ও ইসলামিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং স্থানীয় প্রশাসন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে টাওয়ার হ্যামলেটসের মুসলিম কমিউনিটির নিরাপত্তা, সামাজিক কল্যাণ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে বার্ষিক সাধারণ সভা শেষ হয়।























