শুক্রবার , ১৬ অক্টোবর ২০২৬
Friday , 16 October 2026
২০২৬৭ ২০২৬৩ ২০২৬১

লন্ডন প্রতিনিধি:

প্রকাশিত: ১৮:৩০, ১২ অক্টোবর ২০২৬

লন্ডনের নিউহ্যামে বর্ণাঢ্য আয়োজনে দ্বিতীয় শারদ মেলা ২০২৬ অনুষ্ঠিত

লন্ডনের নিউহ্যামে বর্ণাঢ্য আয়োজনে দ্বিতীয় শারদ মেলা ২০২৬ অনুষ্ঠিত

বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে আয়োজিত এই মেলায় অংশ নেন বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী, বিশিষ্ট রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক কর্মী, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি এবং নানা বয়সের মানুষ।

শারদীয় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে আয়োজিত এই উৎসব পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত মিলন মেলায়। দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঐতিহ্যবাহী সংগীত, নৃত্য, খাবার ও কেনাকাটার পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা গুণীজনদের সম্মাননা প্রদান ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ।

বিকেল ২টায় আয়োজক ও উপস্থাপক অনুপম সাহার সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। প্রদীপ প্রজ্বালন অনুষ্ঠানে অংশ নেন বিশিষ্ট সমাজসেবী ড. সুনীল রায়, ড. চিত্ত চৌধুরী ও পুষ্পিতা গুপ্ত সহ আয়োজক কমিটির সদস্য এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা।

বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতি ও সম্প্রীতির বার্তা

অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নিউহ্যামের মেয়র এবং প্রথম ব্রিটিশ বাংলাদেশি নির্বাহী মেয়র কাউন্সিলর ফরহাদ হুসেইন এবং যুক্তরাজ্যের সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী স্যার স্টিফেন টিমস এমপি।

এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান কাউন্সিলর রোহিত দাশগুপ্ত, ডেপুটি ক্যাবিনেট মেম্বার কাউন্সিলর শান্ত ফেরদৌস, ক্যাবিনেট মেম্বার কাউন্সিলর সেলিম প্যাটেল, ক্যাবিনেট মেম্বার কাউন্সিলর আলেয়া হুসেইন, কাউন্সিলর সাইমন রাশ এবং ইন্টারন্যাশনাল ইলেকশন অবজারভার কমিশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও আফ্রিকা হাউস লন্ডনের গভর্নমেন্ট অ্যান্ড পাবলিক সেক্টর বিভাগের পরিচালক রিচার্ড সেমিটেগো।

আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে অতিথিদের মঞ্চে স্বাগত জানানো হয় এবং ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা ও সম্মাননা জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্যার স্টিফেন টিমস এমপি এ ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নিতে পেরে আনন্দ প্রকাশ করেন। তিনি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে এ ধরনের উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

নিউহ্যামের মেয়র কাউন্সিলর ফরহাদ হুসেইন শারদ মেলার আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং এটিকে একটি চমৎকার উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন সংস্কৃতি ও পটভূমির মানুষকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের অনুষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতি ও তাঁদের উৎসাহব্যঞ্জক বক্তব্য অনুষ্ঠানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।

বাঙালি সংস্কৃতি, সংগীত ও নৃত্যের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা

শারদ মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় জনপ্রিয় সিলেটি লোকসংগীত ধামাইল নৃত্য , ঐতিহ্যবাহী বাংলা গান এবং মনোমুগ্ধকর নৃত্য। বিশেষ করে ‘তাল তরঙ্গ’ পরিবেশনা দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ সৃষ্টি করে এবং উপস্থিত দর্শনার্থীদের করতালিতে অনুষ্ঠানস্থল মুখরিত হয়ে ওঠে।

শিল্পীদের পরিবেশনায় ফুটে ওঠে বাঙালির সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার বৈচিত্র্য।

আয়োজকদের মতে, প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা, সংগীত, নৃত্য ও সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরার ক্ষেত্রে এ ধরনের আয়োজন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এটি বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

জমজমাট মেলা, কেনাকাটা ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিভিন্ন পণ্যের স্টল ও খাবারের আয়োজন।

মেলায় পোশাক, ফ্যাশন সামগ্রী, ঐতিহ্যবাহী পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের সামগ্রীর স্টলে দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। শারদীয় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে কেনাকাটা করেন এবং উৎসবমুখর পরিবেশ উপভোগ করেন।

স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য মেলাটি তাঁদের পণ্য প্রদর্শন, ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে।

মেলায় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার স্বীকৃতি স্বরূপ প্রায় ২০ জন স্টল হোল্ডারকে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানিয়ে আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে স্মারক ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সাত গুণীজনকে সম্মাননা

অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আবেগঘন পর্ব ছিল সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা সাতজন গুণী ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান।

সমাজসেবা, সংগীত, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, জনকল্যাণ ও যুব উন্নয়নে তাঁদের মূল্যবান অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা স্মারক ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন:

. মিহির সরকার — সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য।

. গৌরী চৌধুরী — সংগীত ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য।

. ড. সুনীল রায় — সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য।

. ড. চিত্ত চৌধুরী — সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য।

. হিমাংশু গোস্বামী — সংগীত ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য।

. রণজিৎ সেন — স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণমূলক কাজে বিশেষ অবদানের জন্য।

. সুশিস্মিতা মৈত্র — যুব উন্নয়ন ও তরুণ প্রজন্মের কল্যাণে বিশেষ অবদানের জন্য।

সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে সমাজের প্রতি তাঁদের দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ ও অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সমাজের কল্যাণে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাওয়া ব্যক্তিদের সম্মানিত করা এবং তাঁদের অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা শারদ মেলার অন্যতম উদ্দেশ্য।

এই সম্মাননা পর্ব উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে বিশেষ উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে।

আয়োজক, পৃষ্ঠপোষক ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা

অনুষ্ঠানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বে মেলার সফল আয়োজনে সহযোগিতা প্রদানকারী পৃষ্ঠপোষকদের বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয়।

উপস্থাপক অনুপম সাহা আয়োজক কমিটির সদস্যদের মঞ্চে আমন্ত্রণ জানান। পরে আয়োজকদের পক্ষ থেকে পৃষ্ঠপোষকদের হাতে সম্মাননা স্মারক ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানের প্রস্তাবক পিল্টন দে মেলার সফল আয়োজনের জন্য সন্তোষ ও আনন্দ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল প্রবাসে বসবাসরত মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা, সামাজিক বন্ধন বৃদ্ধি করা এবং বিভিন্ন পটভূমির মানুষকে একটি আনন্দমুখর পরিবেশে একত্রিত করা।

তিনি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সকল অতিথি, শিল্পী, ব্যবসায়ী, পৃষ্ঠপোষক, স্বেচ্ছাসেবক ও দর্শনার্থীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

বিকেল ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলা পুরো অনুষ্ঠান যৌথভাবে উপস্থাপনা করেন অনুপম সাহা, ববি রায় ও পুষ্পিতা দে। তাঁদের প্রাণবন্ত উপস্থাপনা এবং সমন্বয়ে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, অতিথিদের বক্তব্য ও সম্মাননা প্রদানসহ অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্ব সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়।

সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সফল দ্বিতীয় শারদ মেলা

দ্বিতীয় শারদ মেলা ২০২৬-এর সফল আয়োজনের পেছনে ছিল একদল নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক, সমাজকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকের আন্তরিক প্রচেষ্টা, সহযোগিতা এবং নিরলস পরিশ্রম।

আয়োজক কমিটিতে ছিলেন অনুপম সাহা, অজিত সাহা, সুকান্ত মৈত্র, দীপ শর্মা, অমিতোষ মজুমদার, চিন্ময় চৌধুরী, অভিজিৎ দেব, দেবাশীষ রায়, ধীমান মহাজন, বিষাণ মজুমদার, সৈকত দত্ত, মীরা বড়ুয়া, রিয়া রায়, মম রূপু দাস, ববি রায়, নন্দিতা সাহা, শাশ্বতী সাহা, সঞ্জিতা দত্ত, সম্পা দে, পুষ্পিতা দে, মিতা রায়, গঙ্গা রায়, নীহারিকা ভৌমিক, পূর্ণিমা ঘোষ ও পিল্টন দে সহ  প্রমূখ ।
আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল সম্মানিত অতিথি, পৃষ্ঠপোষক, স্টলহোল্ডার, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক, দর্শনার্থী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।

অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করায় হল কর্তৃপক্ষ, মঞ্চ ব্যবস্থাপনা দল এবং সংশ্লিষ্ট সকলকেও বিশেষ ধন্যবাদ জানানো হয়।

আয়োজকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রমাণ করেছে যে, পারস্পরিক সহযোগিতা, ঐক্য ও স্বেচ্ছাসেবামূলক মনোভাব থাকলে একটি সাংস্কৃতিক উদ্যোগকে সফল সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত করা সম্ভব।

আগামী দিনে আরও বৃহৎ পরিসরে শারদ মেলা আয়োজনের প্রত্যাশা

দ্বিতীয় শারদ মেলা ২০২৬-এর সফল সমাপ্তি প্রবাসে বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আরও একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই আয়োজন শুধু একটি উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি হয়ে উঠেছিল পারস্পরিক পরিচয়, বন্ধুত্ব, সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের এক অনন্য মিলনক্ষেত্র।

বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালির সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরা, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করা এবং সমাজের গুণী ব্যক্তিদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে শারদ মেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ভূমিকা পালন করেছে।

আয়োজক কমিটি আশা প্রকাশ করে, সকলের ভালোবাসা, সহযোগিতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আগামী বছরগুলোতে শারদ মেলা আরও বৃহৎ, বর্ণাঢ্য ও সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হবে।

ঐক্য, সম্প্রীতি, বন্ধুত্ব ও সাংস্কৃতিক গৌরবের বার্তা ছড়িয়ে আনন্দঘন পরিবেশে সমাপ্ত হয় দ্বিতীয় শারদ মেলা ২০২৬। উপস্থিত সকলের মনে আনন্দময় স্মৃতি এবং ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে মিলিত হওয়ার প্রত্যাশা রেখে শেষ হয় দিনব্যাপী এই উৎসব।

আলোচিত খবর